Friday, June 23, 2017

পবিত্র আল আরবের নাম পরিবর্তন ও সৌদ বংশের ইতিহাস


টাইমস অব ফেনী ডেস্ক:
বিশ্বের মুসলিমদের কাছে মক্কা ও মদিনা অত্যন্ত পবিত্র নগরী। দুটি শহরই আল আরবে অবস্থিত। ইসলামের প্রাচীণ ইতিহাস ও ঐতিহ্যর নিদর্শন হিসেবে আল আরব বিশ্বে অদ্বিতীয়।

আধুনিক সৌদি আরব (আল আরবে) প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সৌদ রাজবংশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অনেকেরই জানার আগ্রহ, ইসলামের সঙ্গে এই রাজবংশের সম্পর্ক কী?

বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির। তিনি বলেন, সৌদি আরবের(আল আরবের) ইতিহাস হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ইসলামের সঙ্গে সৌদ রাজবংশের কোন  সম্পর্ক নাই। ইসলামে রাজতন্ত্র হারাম, আর সৌদ রাজবংশের ওপর ইসলামের কোন দায়িত্ব ছিল না। তবে তারা পৃথিবীতে শুধু ওহাবিজমকেই ছড়িয়ে দিয়েছে। ওহাবিজমের সাথে আসল ইসলাম ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই। তারা মুসলমানদের পবিত্র স্থান আল আরবের নাম পরিবর্তন করে, তাদের গুষ্ঠিবাদী নাম লাগিয়ে সৌদি আরব করেছে।

ড. আবদুল বাছির বলেন, ‘তারা (সৌদ রাজবংশ) শুধু চেয়েছেন, তাদের একদেশ ভিত্তিক আদর্শকে (ওহাবিজম) সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে। সার্বিক অর্থে তাদের এই আদর্শ অনেকটা খণ্ডিত। তারা শুধু ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। তাদের রাষ্ট্রের যে নামকরণ তারা করেছে ‘কিংডম অব সৌদি আরবিয়া’ তা ইসলামের কোন নিয়ম বা বিধান মেনে করা হয়নি। এটি ইসলাম অনুসারে ঠিকও নয়। তারা যে সেখানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রেখেছেন, এটিও ইসলামের কোন বিধানের মধ্যে পড়ে না।’

সৌদি রাজবংশ ঐতিহাসিকভাবেই অমুসলিমদের সব সময় প্রাধান্য দিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা অমুসলিমদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেছে। সৌদি আরবের বর্তমান যে পতাকা রয়েছে তাতে আড়াআড়িভাবে দুটি তলোয়ার রয়েছে, যার একটি হচ্ছে সৌদ পরিবারের অন্যটি হচ্ছে ওহাবি পরিবারের। এই দুটোর সিম্বল হচ্ছে সেটি। তার মানে বোঝা যায় ধর্মকে ব্যবহার করে তারা রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে।’

আবদুল বাছির বলেন, রিয়াদের কাছে অবস্থিত দিরিয়া নামের একটি কৃষি বসতির প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ বিন সৌদ। এই উচ্চাভিলাষী মরুযোদ্ধা ১৭৪৪ সালে আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের (যিনি ওয়াহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বেশি পরিচিত) সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে ‘দিরিয়া আমিরাত’ গঠন করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে শিরক-বিদাত পালনের অভিযোগ এনে এই দুইজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করেন।

‘ওই দিরিয়া আমিরাতই বিশ্বের প্রথম সৌদি রাজ্য। মুহাম্মদ বিন সৌদ তার পুত্র আবদুল আজিজের সাথে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়ের বিয়ে দেন। এভাবেই সৌদ পরিবার ও ওয়াহাবী মতবাদের মিলনযাত্রা শুরু হয়। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সৌদের মৃত্যু হলে তার ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় ক্ষমতাসীন হয়।’
‘হঠাৎ করে মোহাম্মদ বিন সৌদ এবং মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের কাছে মনে হল, বর্তমানে (তখন) যে ইসলাম চলছে তা সঠিক ইসলাম নয়। সেখানকার শেখের সাথে তাদের কথা হল। তারা এ বিষয়ে একমত হলেন যে বিষয়টির রাজনৈতিক দিক একজন এবং ধর্মীয় দিক অন্যজন দেখবেন। ফলে দু’জনের একজন ধর্মীয় এবং আরেকজন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যুক্ত হলেন। তাদের মতাদর্শ তারা মক্কা-মদিনায় সারা পৃথিবী থেকে যাওয়া মুসলিমদের মধ্যে যদি ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে থাকলেন। এই দুইজনের বোঝাপড়া অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে হয়েছিল।’

‘একসময়ে তারা মক্কা-মদিনা আক্রমণ করে বসলেন। এরপর তারা রিয়াদ নামের স্থানটিকে তাদের রাজধানী করলেন। তুর্কিরা এতে ক্ষিপ্ত হল। তারা মিশরের মোহাম্মদ আলী পাশাকে বললেন যে তারা যে কাজগুলো করছে তা প্রতিহত করা দরকার।’
‘মোহাম্মদ আলী পাশা তার ছেলে ইসমাইলকে পাঠালেন উদীয়মান মতাদর্শকে বিতাড়িত করার জন্য। ইসমাইল এসে সেখান থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করলেন। নতুন মতাদর্শের (ওহাবিজম) ধারক ও বাহকরা যে জায়গা দখল করেছিলেন তা ছেড়ে তারা কুয়েতে পালিয়ে গেলেন।’

‘১৯০১ সালে কুয়েত থেকে সৌদ পরিবারের সন্তান আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ খুব সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে প্রায় ১০০ জন যোদ্ধাসহ রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে পুনরায় রিয়াদ দখল করে নিলেন। তার এই রিয়াদ দখল করার পেছনে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের ধর্মীয় যে মতাদর্শ ছিল সেটি যারা অনুসরণ করতেন, তাদেরকে বলা হতো মুসলিম ব্রাদারহুড। এরা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে সহায়তা করেছিলেন। দুই গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে সৌদের শক্তি বেশ বেড়ে যায়।’

‘১৯১৬ সালে ব্রিটিশ সরকার দেখল, এটি তো একটি উদীয়মান শক্তি এবং এটি যেহেতু তুরস্কের বিরুদ্ধে আর ব্রিটিশদের শত্রু ছিল তুরস্ক সুতরাং এই শক্তিকে যদি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যায়, তাহলে ওরাই তুর্কিদের ধ্বংস করবে। তাহলে ব্রিটিশদেরকে নতুন করে কোন শক্তি প্রয়োগ করতে হবে না। বরং তাদের লাভই হবে। সেজন্য তারা রিয়াদ দখল করা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে মেনে নিয়ে সমর্থন দেয়।’

‘ওই বছরই তাদের গ্রহণ করা অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেয় ব্রিটিশরা। নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্মের মধ্য দিয়ে তুরস্কের আধিপত্য খর্ব হয়। কিন্তু হিজাজে (মক্কা-মদিনা) তখন তুরস্কের শাসক ছিলেন শহীদ ইবনে হোসেন ইবনে আলী ইতিহাসে তিনি শরীফ হোসেন নামে বেশি পরিচিত। তুর্কির সুলতান আবদুল হামিদ তাকে হেজাজের শাসক করেছিলেন এই কারণে যে মহানবীর (স.) পরিবারের সাথে তার যোগসূত্র ছিল এবং তাকে যদি হেজাজের গভর্নর করা হয় তাহলে পশ্চিম বিশ্ব ও সৌদি আরবের মানুষরা মহানবীর পরিবারের বলে তার প্রতি সহানুভূতি দেখাবে । কিন্তু শরীফ হোসনের মনে মনে একটা উদ্দেশ্য ছিল যে তিনি তুরস্কের অধীনে এখানকার প্রশাসক না হয়ে তিনি বংশীয় যে প্রাধান্য সেটি অর্জন করবেন এবং এখানকার স্বাধীন শাসক হবেন।’

‘ফলে তিনিও দেখলেন, এই মুহূর্তে স্বাধীন শাসক হওয়ার জন্য ব্রিটেনের সহযোগিতা বেশি দরকার।আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ এবং শরিফ হাসানের সঙ্গে ব্রিটিশদের যোগাযোগ হল। শরিফ হাসানের সঙ্গে হল প্রকাশ্যে দিনের বেলায়। আর আবদুল আজিজের সঙ্গে হল রাতের বেলায়।’

‘ওহাবিজমের সমর্থনকারীরা কখনো চাইতো না কোন বিদেশি শক্তির সাথে আবদুল ইবনে আজিজের সঙ্গে কোন যোগাযোগ থাকুক। কারণ এটি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে মেনে নেয়া কষ্টকর ছিল। এজন্য সৌদ যোগাযোগ করতেন রাতে এবং শরিফ হোসেন যোগযোগ করতেন দিনের বেলায়।’
‘শরিফ হোসেনের সাথে ব্রিটিশদের ১২টি পত্র বিনিময় হয়েছিল। পরবর্তীতে রাশিয়ার মাধ্যমে এ বিষয় নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। তখন ওহাবিজমে বিশ্বাসীরা একটি সুযোগ পেয়ে যায় যে শরিফ হোসেন মুসলমানদের শাসক হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশদের সাথে যোগাযোগ করছে, সুতরাং তিনি সমগ্র মুসলানের শত্রু। তাকে প্রতিহত করতে হবে। তাকে যদি প্রতিহত করা যায় তাহলে মক্কা এবং মদিনায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাবে। যে ওহাবিজমকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্য তাদের ছিল, সেটি সফল হবে।’

‘১৯২৪ সালে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে শরিফ হোসেনকে আক্রমণ করে। তখন তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কারণ ব্রিটেন তাকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেনি। ব্রিটিশরা তখন উদীয়মান আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে সহযোগিতা করাই তাদের কাছে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেছিল। কারণ ইতোমধ্যে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান– এই রাষ্ট্রগুলো যে ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল তার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বাধা ছিল আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ।’

‘সুতরাং, তাদের কাছে মনে হল, সৌদকে যদি সহযোগিতা করা যায় তাহলে এই রাষ্ট্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা তারা দিতে পারে। এজন্য তারা সৌদের পক্ষে চলে গেল এবং শরিফ হোসেনকে বলা হলো, ঠিক আছে আমরা যদি পরে কোন রাষ্ট্র তৈরি করতে পারি তাহলে আমরা সেখানে তোমাকে বা তোমার ছেলেদেরকে কর্তৃত্ব দিয়ে দেবো। সে অনুযায়ী পরবর্তীতে তারা ইরাক দখল করে সেখানে শরিফ হোসেনের ছেলে হোসেনকে শাসক হিসেবে নিয়োগ করেছিল। শরিফ হোসেনের পতন হল। তার পতনের মধ্য দিয়ে মক্কা মদিনায় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।’

”মুহাম্মদ বিন সৌদের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক। অন্যদিকে আবদুল ওহাব ইবনে নজদীর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয়। এই ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থ এক হয় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩২ সালে ২৩শে সেপ্টেম্বর মাসে আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ সৌদি আরব থেকে নিজের নামে শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। এরপর ১৯৩৪ সালে আল আরবের নাম পরিবর্তন করে, নাম দেয় ‘কিংডম অব সৌদি আরবিয়া’।”
সূত্র : চ্যানেল আই।


শেয়ার করুন