Sunday, June 11, 2017

প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপ


নোয়াখালী প্রতিনিধি:
প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপ। আয়তনে দ্বীপটি খুব বড় নয়, এক ঘন্টা হাটলে দ্বীপের একমাথা থেকে অন্য মাথায় পৌঁছে যাওয়া যায়। প্রায় ১৪,০৫০ একর এলাকা নিয়ে দ্বীপটি গঠিত, ধারণা করা হয় ১৯৫০ এর শুরুর দিকে দ্বীপটি গড়ে ওঠে।

শুরুর দিকে এখানে মানুষ গরু-ছাগল চরাত আসত। জনশ্রুতি আছে, ওসমান নমে এক লোক প্রথম এ দ্বীপে বসতি গড়ে, সে কারণে অনেকে এ দ্বীপটির নাম চর ওসমান নামেও উল্লেখ্য করে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে, নোয়াখালী জেলার দক্ষিণ আংশ বেয়ে জেগে উঠেছে দ্বীপটি। চাইলে যে কোন পর্যটক যে কোন ছুঁটিতে ঘুরে আসতে পারেন নিঝুম দ্বীপ থেকে।

১৯৭০ সালের আগে এখানে কোন স্থায়ী বসতি স্থাপিত হয়নি। ১৯৭০ এর পর থেকে এখানে লোক সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। একসময় নিঝুম দ্বীপ হাতিয়ার নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নিঝুম দ্বীপ এখন আর নিঝুম নেই, ২০০১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১০,৬৭০, বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ২০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। এখানকার মানুষের প্রধান কাজ মাছ ধরা, এর পাশাপাশি তারা কৃষি কাজ ও গবাদি পশু পালনের সাথেও জরিত। এখানে জেলেরা মাছ ধরে রোদে শুকিয়ে বিক্রি করে। প্রতিদিন প্রায় ৭০-৮০ টি লঞ্চ , ট্রলার এবং ছোট-বড় নৌকা শুটকি মাছ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়। বেশির ভাগ সময় যায় চট্টগ্রাম।

নিঝুম দ্বীপটিকে সরকার ২০০১ সালে জাতীয় উদ্ধান হিসাবে ঘোষণা করে। হরিণের অভয়ারণ্য হিসাবে এ দ্বীপটি বিশেষ ভাবে পরিচিত। এ দ্বীপে প্রায় ৫০০০ চিত্রা হরিণ আছে। বাংলাদেশে এরকম অভয়ারণ্য রয়েছে আরো তিনটি। এখানে হরিণ শিকার, চামড়া এবং শিং সংগ্রহ নিষেধ।

নিঝুম দ্বীপের মানুষে জীবন খুবই দুর্বিষহ, দ্বীপে যানবাহন হিসাবে সাইকেল, রিক্সা দু-একটা কদাচিত চেখে পড়ে। রাস্তাও খুব একটা সুবিধার না, উপজেলার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হল নৌকা। নিঝুম দ্বীপ থেকে হাতিয়ায় যেতে ছোট একটি নদী পার হতে হয়। এখানকার বাড়ি গুলো কাঠ,বাঁশ,খড়, টিন দিয়ে তৈরি। বেঁচে থাকার জন্য তারা নিয়মিত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

হাতিয়া থেকে নোয়াখালীতে আসা-যাওয়ার জন্য দিনে একটি নিদিষ্ট সময়ে রয়েছে একটি মাত্র স্টিমার যা এখানে সি-ট্রাক নামে পরিচিত। নির্দিষ্ট সময়ে সিট্রাক ধরতে না পারলে আবার পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় অথবা ট্রলারে যেতে হয়। কিন্তু বিপদের কথা শুনে ট্রলারের মালিকগণ হাকিয়ে বসে পাঁচ-সাত গুণ বেশি ভাড়া। ফলে দরিদ্র অসহায় লোকগুলো আরও অসহায় হয়ে পড়ে। এখানে নেই কোন প্রাইমারি স্কুল, তবে ক্ষুদ্র পরিসরে গড়েওঠা দু-একটি মক্তব চোখে পড়ে। এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে একটি রেস্টহাউস। তার পাশেই রয়েছে ছোট একটি বাজার।

নিঝুম দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনাতীত, এখানে রয়েছে ঘন সবুজ বন, দেখা যায় শাশ মূল ও ঠেশ মূলের গাছ, রয়েছে চিত্রাল হরিণ, বঙ্গোপো সাগরের কোল ঘেষা সুবিশাল বালি রাশি। শীতকালে অসংখ্য অথিতি পাখি এদ্বীপে এসে ভিড় জমায়। নিঝুম দ্বীপের পাশেই রয়েছে আরও ছোট-ছোট কিছু দ্বীপ, সেখানেও রয়েছে জন বসতি। এখানে উপভোগ করা যায় নৌকা ভ্রমণ,সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।

সরকার ইচ্ছে করলেই এদ্বীপটিকে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। তাহলে এক দিকে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং অপর দিকে সমৃদ্ধ হবে সরকারের রাজস্ব ভান্ডার। এখনও প্রতিদিন বহু পর্যটক এখানে আসে, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হলে আরও পর্যটকের আনাগোনা বাড়বে, এমনকি এখানকার মানুষের জীবন-যাত্রার মানও উন্নত হবে।

শেয়ার করুন